সে ফিরে আসে

ভাই,কসম করে বলছি মেয়েটাকে আমি খুন করিনি। আর খুন করার প্রশ্নই ওঠা উচিত নয় এখানে কারণ মেয়েটা মৃত নয়। দিনে মেয়েটার শরীর লাশের মতো পরে থাকলেও সন্ধ্যার পর ওতে প্রাণ ফিরে আসে। মেয়েটা নিজ মুখে আমায় বলেছে।’
‘দেখুন ভাই, আপনাকে দেখে ভদ্রলোক বলে মনে হচ্ছে দেখে এখনো পর্যন্ত ভালো ব্যবহার করে যাচ্ছি।আপনি যে কী ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছেন নিজেই বুঝতে পারছেন না। যত দেরি করবেন ততই ঝামেলা বাড়বে। দ্রুত পরিবারের কারো সাথে বা একজন ভালো আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন এইসব আজগুবি কথা রেখে।’
‘পুরো কাহিনীটা তো শুনবেন? এখন বিকাল ৩টা বাজে। আর ৩ ঘন্টা পর সন্ধ্যা নামবে। আপনি দেখবেন মৃত মেয়েটা কিভাবে জেগে ওঠে! মেয়েটা নিজ থেকে আমার গাড়িতে উঠে…….।’
‘চুপ! চুপ হারামজাদা! ভদ্রভাষা বুঝিস না, গাল-গল্প করার জায়গা না এইটা। চুপচাপ বইসা থাক এইখানে, বড় স্যার আসার আগে পর্যন্ত। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট আসলেই বুঝতে পারবি কত ধানে কত চাল!’
পুলিশ লোকটা ভালো থেকে হঠাৎ এমন ব্যবহারে নেমে যাওয়ার পরোয়া করলেন না বাপ্পি সাহেব। সে আবার বলল, ‘ভাই, শুধুমাত্র ৩টা ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। যদি না মেয়েটার শরীরে প্রাণ ফিরে আসে সাথে সাথেই আমারে ফাঁসি দিয়েন। কিন্তু জীবিত মেয়েটার শরীর কাটাকুটি করবেন না!’
পুলিশ অফিসার অনেক কষ্টে জিহ্বার গোড়ায় চলে আসা বিশ্রী গালিটা আটকালেন। মানুষে ভরে আছে থানা এখন। পরে দেখে নেয়া যাবে বেটাকে!
বাপ্পি সাহেবকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় আটকে রাখা হলো। সন্ধ্যার বেশ কিছুক্ষণ পর পুলিশ অফিসার এসে থানায় হাজির হলেন উদগ্রীব ভাবে। মেয়েটার লাশ হাসপাতাল থেকে উধাও হয়ে গেছে।
রাত ৮টা। মেয়েটা তারপাশে বসতেই আরিফ নাক কুঁচকে ফেলল। কেমন এক উৎকট পঁচা গন্ধ নাকে ভেসে আসছে। সে বাসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ময়লার ভাগাড় কোথায় খোঁজার চেষ্টা করলো। শেষে জানলা বন্ধ করে দিয়ে পাশে বসা মেয়েটার দিকে তাকালো। ওর মুখ দেখা যাচ্ছে না, ঘোমটা দিয়ে ঢাকা। দুই উরুর উপর হাত রেখে মাথা নিচু করে বসে আছে। মেয়েটার শরীর থেকে এমন গন্ধ আসছে! তা কী করে হয়!
ঘন্টা খানিক পর বাসটা একটা স্টপেজ এ থামলো।। মেয়েটা উঠে টলতে টলতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে গেল সে এক গলিতে। আরিফ বিস্মিত হয়ে খেয়াল করলো মেয়েটা চলে যাওয়ার সাথে সাথেই পঁচা উৎকট গন্ধটাও হওয়া হয়ে গেল।
রাত ১০টা। রিকশাওয়ালা মনসুর অটোরিকশা টেনে এগিয়ে যাচ্ছে। এটাই তার শেষ ট্রিপ আজকের জন্য। রাত হলেও পরিবেশটা সুন্দর। ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে ভেসে আসা পঁচা মাংসের গন্ধটা শুধু বিরক্ত করছে তাকে। বেশ কিছু বছর আগের এক ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে তার। এক নারী শুকনো খালের পাড়ে শাক তুলতে তুলতে ঘন ঘাসের কাছাকাছি চলে যায়। কটু একটা গন্ধ লক্ষ্য করে সামনের কয়েক গোছা ঘাস সরাতেই দেখতে পায় সেখানে একটা মানুষের পঁচা-গলা মাথা তার দিকে মুখ করে রয়েছে। লাশটার শরীরের বাকি অংশ লম্বা করে মাটির নিচে পুঁতে ছিল। চিৎকার করতে থাকে নারীটি। রিকশা নিয়েই কোথাও যাচ্ছিল সেদিন মনসুর। এগিয়ে যায় সেদিকে। জীবনের প্রথম মানুষের পঁচা মাংসের গন্ধ অনুভূত করে। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে গন্ধ সহ্য করে সেদিন লাশটা তুলতে দেখেছিল সে।
কথাটা মনে হতেই তার পেট গুলিয়ে ওঠে যেকোনো সময়। আজ হঠাৎ এই পঁচা গন্ধে সেই লাশ পঁচা গন্ধের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। পিছনের সিটে একমাত্র নারী পেসেঞ্জারটি দুই হাত উরুতে রেখে মাথা নিচু করে বসে আছে। ঘোমটা দিয়ে ঢাকা হওয়ায় মুখটা এখনো দেখেনি মনসুর। একবার তাকে সে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপা, গন্ধ পাইতাসেন নাকে কোনো?’ কিন্তু কোনো উত্তরই দেয়নি সে।
অদ্ভুত লাগছে মনসুরের কাছে মেয়েটির ব্যবহার। একটা কাগজ শুধু রিকশায় ওঠার আগে মেয়েটি দিয়েছিল তাকে, সেখানে লেখা ছিল তার গন্তব্যস্থানের নাম।
একটা বাড়ির সামনে রিকশা এসে পৌঁছাতেই রিকশা থামালো মনসুর। মেয়েটি রিকশা থেকে নেমে এগিয়ে যেতে লাগলো বাড়িটির দিকে। মনসুর কিছুটা বিচলিত হয়ে বলল, ‘আপা, ভাড়াটা?’
মেয়েটা তার দিকে ঘুরে ঘোমটা টা নামিয়ে ফেলল। মনসুরের হৃৎপিণ্ড কয়েকবার লাফিয়ে যেন পাঁজরে আঘাত করলো। একটা ফ্যাকাসে লাশ দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। মেয়েটার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। এক মুহূর্তে সে বুঝতে পারলো এটা কোনো মানুষ হতে পারে না। প্রাণ বাঁচাতে রিকশা উল্টো ঘুরিয়ে ছুটে চললো সে পাগলের মতো।
মেয়েটা আবার ঘোমটা টেনে নিল মাথায়। সামনের বাড়িটার দিকে হাঁটতে লাগলো। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে টানা কয়েকবার কলিং বেল বাজালো। ৫ মিনিট পর দরজা খুলে উকি দিল এক মেয়েলোক, ‘কাকে চাই এত রাতে?’
এইটুকু শক্তিই যেন সঞ্চয় করে রেখেছিল সে এতটা দীর্ঘ পথ আসার জন্য। ঘোমটা ফেলে দিল সে। চিৎকার করে উঠলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা। ধাক্কা দিয়ে মেয়েটাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকলো সে। সামনের মেয়েটা এই কুৎসিত ফ্যাকাসে মুখের মেয়েটাকে চিনতে পেরে হাটুগেড়ে বসে পড়লো, ‘ক্ষমা করে দাও আমায় আপু, আমি চাইনি তুমি মারা যাও! পুরো প্ল্যানটা দুলা ভাইয়ের ছিল। সেই তোমাকে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে অতদূর দিয়ে গিয়ে…….।’ আর কিছু বলার সুযোগ পেল না মেয়েটি। সে যার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাইছিল সে শাড়ির ভাঁজের আড়াল থেকে একটা ছুরি বের করে চালিয়ে দিয়েছে তার গলা বরাবর। কণ্ঠনালী কেটে ছিটকে বের হতে লাগলো রক্তের ধারা। লুটিয়ে পড়লো আগন্তুকের কলিং বেল এর আওয়াজে জেগে ওঠা মেয়েটির নিথর দেহ।
সাজ্জাদ লাফিয়ে উঠল তার শালিকা কিংবা হবু বউ নিপার আর্তনাদের শব্দ শুনে। কলিং বেল বাজানোর শব্দ শোনার পর তাকে বিছানায় রেখে নীচে গিয়েছিল মেয়েটি। এভাবে চিৎকার করলো কেন সে! কে এসেছে! সিঁড়ি বেয়ে কারও ধীরপায়ে উপরে উঠে আসার শব্দ পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেল সে, ‘তোমাকে না বলেছি সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে উঠবে, পিছলে গিয়েছিলে? নাকি মাকড়সা দেখে চিৎকারটা ঝাড়লে? কে এসেছিল?’
কোনো উত্তর পেল না। দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো একটি ছায়া। ডিম লাইটের আলোয় শাড়ি পরিহিত মেয়েটিকে ঘরে ঢুকতে দেখে শিউরে উঠল সে। মেয়েটার হাতে একটা ছুরি, ওটা থেকে তরল কিছু একটা ঝরে ঝরে পড়ছে মেঝেতে। মেয়েটা তার শালিকা নয়! আরেকটু কাছে এগিয়ে আসতেই চিনতে পারলো তাকে! তার স্ত্রী! মৃত স্ত্রী! তার প্রেমের পথে বাধা হওয়ায় পাহাড়ে ঘুরতে নিয়ে গিয়ে তুলে দিয়েছিল সে তাকে এক ডাকাত দলের হাতে সপ্তাহ খানেক আগে। কথা ছিল তারা ওকে হত্যা করে উধাও করে দেবে। এরপর নিজের শখের গাড়িটা খাদে ফেলে মিথ্যা এক্সিডেন্ট এর নাটকও সেরে ফেলে সে। পুলিশি বা পারিবারিক ঝামেলাও পোহাতে হয়নি।
কিন্তু সেই স্ত্রী এখানে কী করে চলে এলো বুঝতে পারছে না সাজ্জাদ। উৎকট পঁচা গন্ধটা আর মেয়েটার ফ্যাকাসে মুখের উপর জ্বলজ্বলে চোখ দুটোই যেন বলে দিল তাকে সব। ওগুলো ক্রোধে কাঁপছে। গলার সব শক্তি দিয়ে চিৎকার জুড়ে দিল সাজ্জাদ। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে নড়তে। মেয়েটার হাতের ধারালো ছুরির ডগাটা স্পর্শ করে ফেলেছে তার কোমল গলার চামড়া!

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প