চক্রায়ন

কলা বিক্রেতা মুদি দোকানে গিয়ে বলল, ‘কাল রাতে যে মুগের ডাল নিয়ে গিয়েছিলাম আজ সকালে তা রান্না করতে গিয়ে বউ দেখল সেগুলোতে রং মেশানো। পানিতে ভিজাতেই পানির রং হলুদ হয়ে গেছে। পরিচিত লোকের সাথে এমন কাজ করা তোমার ঠিক হয় নাই।’

মুদি দোকানদার বলল, ‘সব মুগ ডাল রং মেশানো তোমাকে রং ছাড়া ডাল দিব কিভাবে?’

কলা বিক্রেতা বলল, ‘তাহলে বলছেন যে ডালে রং মেশানো আছে অন্য দোকান থেকে নিতে।’

মুদি দোকানদার বলল, ‘তুমিও তো কলায় কেমিক্যাল মেশাও। আমি কলা কিনতে গেলে বল নাকি যে আমার কলায় কেমিক্যাল মেশানো অন্য দোকান থেকে নাও।’

কলা বিক্রেতা বলল, ‘কলা তাড়াতাড়ি পাকাতে গেলে, ভালো রং আনাতে গেলে কেমিক্যাল মেশাতে হয়।’

মুদি দোকানদার বলল, ‘আমার ডালের রংও ভালো করতে গেলে রং মেশাতে হয়।’

পাশের গুড়ের দোকানদার বলল, ‘তোমাদের দোকান থেকে আর জিনিস কেনা যাবে না তোমরা দুই নাম্বার জিনিস বিক্রি করো।’

কলা বিক্রেতা রেগে বলল, ‘তুমি আবার কোন ফেরেস্তা হইছ। বেচ তো ভেজাল গুড়। তুমিও তো খেজুরের গুড়ের কথা বলে চিনি-রং দিয়ে বানানো নকল গুড় বিক্রি করো।’

গুড় বিক্রেতা বলল, ‘আমি তো নিজে ভেজাল গুড় বানাই না, রং মেশাই না। যাদের কাছ থেকে কিনি তারা এমন করে। আর তোমরা নিজেরা মেশাও।’

মুদি দোকানদার বলল, ‘অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপালে পার পাওয়া যায় না। যেখান থেকে পাইকারী দরে গুড় কেনো সেখানে কী আসল গুড় নাই? তুমি কম দামে নকল গুড় কিনে আনো।’

পাশের ফল বিক্রেতা বলল, এই সব কেমিক্যাল, রং শরীরের জন্য খারাপ, ক্যান্সার হয়।

গুড়ের দোকানদার বলল,‘ আচ্ছা আর চিনির সিরায় কিচমিচ ভিজিয়ে তারপর শুকিয়ে বিক্রি করা খুব ভালো নাকি? সেই কিচমিচ মনে হয় শরীরের জন্য ভালো!

‘আমি চিনির সিরায় কিচমিচ চুবাই কিন্তু কেমিক্যাল
তো মিশাই না। চিনি তো খারাপ জিনিস না।’

এমন সময় পাশের মসলার দোকানে একটি ছেলে এলো। সে মসলার দোকানদারের বাড়িতে দুধ দেয়। সে দুধের দাম নিতে এসেছে।

এতক্ষণ মসলার দোকানদার অন্য দোকানদারদের তর্কাতর্কি শুনছিল। এবার এদেরকে খোঁচা দেওয়ার জন্য সে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল, কিহে তোদের দুধে পানি মেশাস নাকি?

ছেলেটি বলল, আমার মালিক ডাকাতি করেনা, যেটা না করলে নয় সেটাই করে। টিউবওয়েলের ভালো পানি অল্প পরিমাণ মেশায়। আবার দুধের ঘনত্ব ঠিক রাখার জন্য পাউডার মেশায়।

মসলার দোকানদার বলল, তোর মহাজন দেখছি হাজী মানুষ। ওদের মতো বাটপার। বাটপারি করলের লিমিটের মাঝে আছে।

মুদি দোকানদার বলল, ‘আমরা সবাই বাটপার আর উনি একাই সাধু। জিরার সাথে মৌরি মিশায় বিক্রি করে, দেশি এলাচের সাথে বিদেশি এলাচ মিশিয়ে বিদেশি হিসাবে বেশি দামে বিক্রি করে। এগুলো কোন বাটপারের কাজ!

মসলার দোকানদারকে বাটপার বলায় সে রেগে আগুন হয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করল। তার চিল্লাচিল্লি শুনে অনেক মানুষ জমে গেল। তাদের মধ্যে একজন উকিল আর একজন এজি অফিসের অফিসার ছিল। তারা আবার স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন, দীর্ঘদিন বাঁচার ইচ্ছা তাদের। উকিল সাহেব হাই কোর্ট দেখালো। অবস্থা বেগতিক দেখে একজন বাজার কমিটির সভাপতিকে কল দিল।

বাজার কমিটির সভাপতি বলল, এবার সবাই শান্ত হন। আগামী সোমবার রাতে মিটিং ডাকা হলো। মিটিং-এ এসব ব্যাপারে কথা হবে।

মিটিং-এ অভিযোগ শোনার পর সভাপতি বলল- তাহলে খতিয়ে দেখা হোক-কে কে ভেজাল দেয়, দুই নাম্বারি করে।

খতিয়ে দেখার প্রয়োজন হলো না। এক ব্যবসায়ী আরেক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে লাগল। এতে যা জানা গেল তাতে করে বাজারের কোনো দোকানদারই ভালো না। সবাই কোনো না কোনোভাবে অসদুপায় অবলম্বন করে।

মাছ বিক্রেতা মাছে ফরমালিন দেয়, রং মিশায় আর জ্যান্ত মাছ বিক্রি করার সময় মাছের সাথে পালিব্যাগে পানি উঠিয়ে ওজনে কম দেয়।

পোল্ট্রি মাংসের দোকানদার ওজনে কম দেয়, মুরগী -হাঁসকে জোর করে খাবার খাইয়ে ওজন বাড়ায়।

গোশতের দোকানদার গোশতের রং ভালো করার জন্য রক্ত মিশায়, হাড়ের ভেতর চর্বি ঢুকিয়ে দেয়।

ফলের দোকানদার অপরিপক্ব ফলকে কেমিক্যাল দিয়ে পাকায়, কীটনাশক দেয়।

শুটকির দোকানদার শুটকিতে কীটনাশক দেয় যাতে পোকা না ধরে।

কাঁচা বাজারের দোকানে উপরে টাটকা সবজি থাকলেও নিচে থাকে বাসি ও পচা সবজি। শাকের আটির বাঁধনের আড়ালে ভেতরে পঁচা শাক থাকে।

সোনার দোকানেও ভেজাল। সোনার সাথে তামা ভেজাল দেয়।
মালাই চায়ে টিস্যু, জিলাপিতে স্যান্টু,
মুড়িতে ইউরিয়া দেয়। ডাল , হলুদের গুড়া, মরিচের গুড়া, মসলার গুড়া, লবণ, চিনি, তেল সব জায়গায়
ভেজাল!

এমন কী সভাপতির স্বাক্ষরিত মিটিং-এর ব্যয়ের হিসেবে বইয়েও ভেজাল বেরোল। উকিলের সাক্ষীতেও ভেজাল। অফিসারের আয়-ব্যয়ে গড়মিল, ঘুষখোর অফিসার সে।

অবশেষে এমন ভেজাল অবস্থা দেখে সভাপতি বলল,
কাকে আর কি বলল। সবাইতো ভেজালের কারবার করতেছে। জল থেকে চাল সবকিছুতে ভেজাল। ওই সিস্টেম পাল্টাতে গেলে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হওয়ার মতো হবে। সেভাবে চলছিল সেই ভাবেই চলুক। শুধু আমাদের বাইরে-অন্য-কোনো লোক ব্যাপারটি না জানুক।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প